মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ছাড়া আমাদের জাতীয় অগ্রগতি থমকে পড়বে— মাহ্রুখ মহিউদ্দীন
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন-বাংলাদেশের সমকালীন কর্পোরেট নেতৃত্বে সুপরিচিত নাম। দেশের সুনামধারী শীর্ষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানকে কেবল পরিচালনা করছেন না, তিনি এখনকার প্রতিযোগিতামুখী বিশ্বে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্ভাবনী চিন্তায় প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও মানবিক মূল্যবোধ একসঙ্গে কাজ করে-যা ইউপিএল-এর সাংগঠনিক সংস্কৃতিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে করেছে বাস্তবমুখী, আর দূরদর্শিতা দিয়েছে নতুন নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সাহস। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য সে প্রতিষ্ঠানের মানুষের মধ্যেই নিহিত। তাই কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরিতে তাঁর বিশেষ মনোযোগ। এই সাক্ষাৎকারে মাহ্রুখ মহিউদ্দীন তাঁর নেতৃত্বদর্শন, ইউপিএল-এর কর্ম-পরিকল্পনা এবং পরিবর্তনশীল ব্যবসায়িক বাস্তবতায় টিকে থাকার কৌশল নিয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ আলাপ তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহন করেছেন- এহসান হায়দার
অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে ঘিরে আপনার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি কেমন?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: আমরা সারা বছর ধরে বই প্রকাশের কাজ করি; তাই আমাদের প্রস্তুতি বছরজুড়েই চলে। অন্য সব বছরের চেয়ে এই বছরটা ভিন্ন ছিল নানান দিক থেকে। একটা গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা একটা নতুন সময়ে উপনীত হয়েছি। আন্দোলনের দুই মাস, এবং তার ঠিক পরেই ভয়াবহ বন্যার ফলে আমাদের কর্মপরিকল্পনায় বেশ কিছু পরিবর্তন করতে হয়েছে। এরপরও বেশ কিছু দারুণ বই এবার আমরা পাঠকদের জন্য নিয়ে আসতে পারব বলে আশা করছি। নতুন সময়ে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে যে, আমরা বাকস্বাধীনতা ও প্রকাশনার স্বাধীনতার স্বাদ পাব, এবং ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়ার মানসিকতায় ফিরে যাওয়ার আশ্বাস পাব সকলের কাছ থেকে।
এবারের মেলায় আপনার প্রকাশনা সংস্থা থেকে যে সব গ্রন্থ প্রকাশ হচ্ছে- সেখানে কী ধরনের গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি প্রাধান্য পেয়েছে?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: প্রতিবারের মতোই এবারও আমাদের প্রকাশনায় বাংলা ও ইংরেজি গবেষণাধর্মী বই, বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্মৃতিকথা এবং অনুবাদগ্রন্থ পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করার পরিকল্পনা আছে। পাশাপাশি প্রকৃতি-পরিচয়ের সাথে যৌথভাবে প্রকাশিত শিশু ও কিশোরদের জন্যও বেশ কিছু নতুন বই থাকবে। এবারের ভিন্নতার দিক থেকে আমাদের কিছু কথাসাহিত্য প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে কিছু আকর্ষণীয় প্রকাশনাও আমাদের এবারের তালিকায় থাকবে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউপিএল থেকে সবসময়ই গবেষণাধর্মী ননফিকশনের অনুবাদ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।
আসন্ন বইমেলাতে নূতন কী ধরনের গবেষণামূলক বই আসছে?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: এবারের তালিকায় বেশ কিছু ভালো অনুবাদ আমরা যুক্ত করতে পেরেছি। ইতোমধ্যে ভেলাম ভান সেন্দেলের বাংলাদেশ জনপদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের Political Parties in India এবং রিচার্ড ইটনের Rise of Islam বইয়ের অনুবাদও এবার প্রকাশিতব্য। এছাড়াও এবার Oxford University Press থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক নাওমি হোসাইনের The Aid Lab: Understanding Bangladesh's Unexpected Success বইটির আঞ্চলিক সংস্করণও আমরা প্রকাশ করতে যাচ্ছি। শরণার্থী সঙ্গে বসবাস: রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাঙালির প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা বইটি শরণার্থী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মিথস্ক্রিয়ার ওপর একটি ভিন্নধরণের গবেষণাগ্রন্থ, এটি ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও এবার তালিকায় রয়েছে অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদের নীল বিদ্রোহ নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ Indigo Rebellion, ক্লিন্টন বি সিলি'র সাহিত্য সমালোচনামূলক প্রবন্ধের বই Barisal and Beyond: Essays on Bangla Literature, ফারুক আহমেদ-এর লেখা উপনিবেশ আমলে সিলেটের ইতিহাস, সারোয়ার তুষার প্রণীত ফিলিস্তিন: একুশ শতকের উপনিবেশের ইতিহাস, অ্যালেক্স কাউন্টস রচিত Small Loans Big Dreams: Muhammad Yunus, Grameen Bank and the Global Microfinance Revolution, সফিক ইসলাম রচিত ওমর খৈয়াম: সুরা ও শাকি ছাড়িয়ে ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই এবার থাকবে, বীর প্রতীক শাহজামান মজুমদার রচিত এক কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তালিকায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে স্থানীয় ইংরেজি পত্রিকার ভূমিকা নিয়ে অধ্যাপক শিবলী আহমেদ খান প্রণীত একটি বই, অধ্যাপক আলমগীর সিরাজউদ্দীন সম্পাদিত গার্ডিয়ান উইকলিতে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের খবরের সংকলন, এবং কিছু স্মৃতিকথা।
"মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ছাড়া আমাদের জাতীয় অগ্রগতি থমকে পড়বে নিঃসন্দেহে।"
অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমতি নিয়ে ও কপিরাইট মান্য করে প্রকাশ করাকে ইউপিএল অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে বলেই জানি- এ প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে বিস্তারিত বলবেন কি?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: এই প্রক্রিয়াটি জটিল কিছু নয়, তবে সময়সাপেক্ষ। সব ক্ষেত্রে একই নিয়মে অনুমতি পাওয়া যায় বিষয়টা তেমনও নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই লেখকরা তাদের এজেন্ট অথবা প্রকাশকের মাধ্যমে অনুবাদ স্বত্ব দিয়ে থাকেন। আমরা কি পরিমাণ বই ছাপব, কত দাম রাখা হবে, এই সবের ভিত্তিতে রয়্যাল্টি নির্ধারিত হয়, এবং সেই অনুযায়ী চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় খানিকটা সময় লাগলেও এটা অনুবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এক রকম তৃপ্তি আর আত্মবিশ্বাস দেয়, যে আমরা লেখকের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখছি, এবং পাঠকের হাতে আইনানুগ একটা অনুবাদ তুলে দিচ্ছি। খুব বিশাল অংকের রয়্যালটি চাইলে সেক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে এগোন সম্ভব হয় না, তবে এমন ঘটনা বিরল। প্রকাশক বা লেখক চান একটা ন্যায্য বন্দোবস্ত। এই মর্যাদাটুকুর আশ্বাস পেলে অনেক সহজ শর্তে অনেক প্রকাশকই রাজি হন। আর বাংলা ভাষায় তাদের বইটি পাওয়া যাবে এতে তাঁরা খুশিই হন।
নবীন লেখকদের পান্ডুলিপির ক্ষেত্রে এ বছর কেমন গুরুত্ব দিয়েছেন?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: আমাদের জন্য লেখকের বয়স বা অভিজ্ঞতার চেয়ে পাণ্ডুলিপির মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ সব সময়ই। বয়সের বিচারে নবীন কয়েকজনের বই প্রকাশিত হবে এবারও, কিন্তু নবীন কোটায় তাদের বই প্রকাশ করা হচ্ছে না, হচ্ছে মানের বিচারে।
এবারের বইমেলার আয়োজনে পাঠকের মনের খোরাক বা পাঠের পছন্দ পূরণে সমর্থ হবেন কি প্রকাশকরা?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: এই প্রশ্নটা আরও অনেক প্রশ্নের অবতারণা করে। তাহলে প্রকাশকদের কাজ কি শুধুই পাঠকের মনের খোরাক যোগানো? পাঠক কি সবসময় জানেন যে তিনি কি পড়তে চান? তাঁদের প্রেফারেন্স থাকতে পারে নির্দিষ্ট, তবে প্রকাশকের, গণমাধ্যমের এবং সাহিত্য-আলোচকদের দায়িত্বের মধ্যে কি এটাও পড়ে না যে তাঁরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঠককে কিছুটা পথ দেখাবেন, কোনো ক্ষেত্রে পরিচয় করিয়ে দেবেন? পাঠক আগে পড়বেন বলে ভাবেননি এমন কিছু পড়তে তাঁকে উৎসাহিত করবেন? আরও যেসব প্রশ্ন করতে ইচ্ছা হয় কতজন প্রকাশক সত্যিকার অর্থে রিডিং সোসাইটি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন? কতজন আসলে আদৌ পাঠকের কথা ভাবেন? এক যুগের বেশি সময় ধরে শুধুমাত্র সরকারি সাপ্লাইয়ে বই ঢোকানোর উদ্দেশ্যে কিছু প্রকাশক সেই ধরণের বই প্রকাশ করেছেন, এমনকি কেউ কেউ রাতারাতি প্রকাশনা পেশা গ্রহণও করেছেন। এই "প্রকাশক"দের কাছ থেকে আমরা আসলে কী প্রত্যাশা করবো? আবার কিছু স্বপ্ন দেখা প্রকাশক টিকতে না পেরে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। একটা নৈতিকতার মন্দা গেছে অনেকগুলি বছর, আর সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন-দেখাও আমরা ভুলতে বসেছিলাম প্রায়। সময়টা মাত্র পাল্টেছে সামান্য। আমরা সবাই মিলে আশা করতে পারি যে এই "পাল্টানো সময়ে স্বপ্নের পাখিগুলো" বেঁচে থাকবে, আরও ডানা মেলবে। তাঁদের ডানা হীনমন্যতায় সংকুচিত হবে না, অযৌক্তিক চোখ-রাঙানিতে ক্ষত-বিক্ষত হবে না। আপনার প্রশ্নের উত্তর আশা করি পেয়েছেন।
বই পাঠকের বাইরে প্রকাশকদের বড় ভরসা যেটি জানি তা হলো প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয়, সেটি এদেশে কেমন অবস্থায় রয়েছে?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: এ নিয়ে একটা আস্ত প্রবন্ধ লিখতে হবে। তবে সংক্ষেপে এইটুকু বলতে পারি যে প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয় যে প্রক্রিয়ায় ঘটে সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে প্রথমে। নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মনোযোগ দিতে হবে। প্রতিষ্ঠান যখন ক্রয় করে তখন তা হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকা, কিম্বা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান হলে তা শেয়ারহোল্ডারদের টাকা। এই টাকার সদ্ব্যবহার করার দায় সরকারের বা যারা ব্যবস্থাপনায় আছেন, তাঁদের। এমন একটা ব্যাপার দাঁড়িয়েছে আজকাল যে, যে কেউ বই বাছাইয়ে বসে যান। বই বাছাইয়ের জন্য যে দক্ষতা বা পাণ্ডিত্য লাগে, একজন পাঁড় পাঠকের চোখ আর অভিজ্ঞতা লাগে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ধারণাটাই বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই। এই জায়গাতে আমাদের অনেক দূর যাওয়ার আছে। তবে ধীরে ধীরে এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে, সেটা একটা ভরসার জায়গা।
সম্পাদনা ও উৎপাদনের মান ঠিক রেখে দ্রুততম সময়ে গ্রন্থ প্রকাশ করার চ্যালেঞ্জ প্রতিটি প্রকাশনার ক্ষেত্রেই থাকে। শেষ পর্যন্ত একটি বই কেমন রূপ নিচ্ছে তা গ্রন্থ নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে যারা কাজ করছেন তাদের পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার ওপর নির্ভর করে। এই সকল দিকগুলোকে কীভাবে আপনি ব্যবস্থাপনা করে থাকেন?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: আমরা চেষ্টা করি বিশ্বমানের বই তৈরি করতে। পাণ্ডুলিপিকে বই পর্যন্ত নিয়ে যেতে প্রতিটি ধাপে দক্ষ এবং উপযুক্ত সম্পাদকদের নিয়োগ দিতে চেষ্টা করি। তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকে। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে আমরা কাজগুলি করি, কেননা ইংরেজি এবং বাংলা, দুই ভাষাতেই ভালো সম্পাদক পাওয়া, এবং তাদের ব্যয় বহন করা সব বইয়ের জন্য সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ও লেগে যায়; লেখকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। আরও বিস্তারিত বুঝতে চাইলে ছয়মাস ইউপিএল-এর সম্পাদনা বিভাগে ইন্টার্নশিপ করলে এটা খানিকটা জানা যাবে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। বদলে যাচ্ছে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, জীবন ও যাপন। সকলের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস। মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে আমাদের বিচরণ। তথ্য-প্রযুক্তির নিত্যনতুন উৎকর্ষে পরিবর্তিত হচ্ছে পৃথিবীর শিল্প ও অর্থনীতি। প্রশ্নটা যদি বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্প নিয়ে হয়, ডিজিটাল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোথায় আমাদের অবস্থান?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: এই নিয়ে কোনো গবেষণা নেই, তাই এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। আমাদের সেক্টর নিয়ে গবেষণা হোক, এই আওয়াজ তুলুন, এবং গবেষণায় এই প্রশ্নটা রাখুন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা টিকে আছি ভালো বই বিক্রি করে। কাজেই ডিজিটাল বিশ্ব আমাদের পাঠকদের যথেষ্ট পরিমাণে ছিনিয়ে নিতে পারেনি। এত পরিমাণ নতুন এবং নবীন প্রকাশক এই পেশায় আসছেন, তাঁরা কি এই প্রযুক্তির উৎকর্ষের খবর পাননি? পেয়েও কেন তাঁরা মুদ্রিত বইয়ের সদাই করতে আসছেন, এটা জানা প্রয়োজন। আবার একই সঙ্গে এটা মানতেই হবে যে সামনের দিন কন্টেন্টের। যার কাছে যত কন্টেন্ট আছে, সে তত ধনী। এখন এ-আই/চ্যাট-জিপিটি আমাদের জন্য কোনো কোনো দিক থেকে বিপদের, আবার কোনো কোনো দিক থেকে এরা মুশকিল আসানের উপায়।
কাগজের দামের ওপর অস্বাভাবিক কর-এখানে মানসম্পন্ন প্রকাশনাকে পাঠকের ক্রয়সীমার মাঝে রাখাকে অসম্ভব করে তুলেছে, এই বিষয়ে আপনার ভাবনা কি?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: এটা আমার প্রিয় প্রসঙ্গ। আর কষ্টেরও বটে। এখন পর্যন্ত কোন প্রকাশক গোষ্ঠী এই বিষয়ে নীতি-নির্ধারণী জায়গায় যথেষ্ট অগ্রগতি দেখায়নি। অথচ কাগজ আমদানিতে প্রায় ৬২% শুল্ক ধরা হয়, এবং দেশীয় কাগজ কম্পানিগুলি সেই সুযোগ নিয়ে অস্বাভাবিক মুনাফা আয় করে, আমাদেরকে তুলনামূলক খারাপ কাগজের কাছে জিম্মি রেখে। বইয়ের দাম পাঠকের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে এখানে প্রকাশকদের একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে, কিন্তু সেই নজির আমরা এখনও দেখিনি। পরিবর্তিত সময়ে আশা করি দেখব, বা নিজেরাই উদ্যোগ নেব।
একজন ভালো প্রকাশক ভালো পাঠক তৈরির কাজটিও করেন- এটি নিয়ে আপনার নিজের ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ কেমন?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: ৬নং প্রশ্নে এই সম্পর্কে বলেছি। তবে ভালো পাঠক তৈরির জন্য দরকার এমন একটা ইকোসিস্টেম যা রিডিং সোসাইটি গঠনে তৎপর থাকবে। এখানে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের কিছু কিছু উদ্যোগ আছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়।
বাণিজ্যিক ধারার গ্রন্থ প্রকাশকে অধিকাংশ প্রকাশক বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন-এতে করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকাশনার গ্রন্থের মানও নিম্নমুখি হয়ে পড়ে, এ বিষয়টি নিয়ে আপনার ভাবনা কি?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: এই প্রশ্নে "বাণিজ্যিক ধারা" বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন তা পরিষ্কার নয়। প্রকাশক কি মুনাফা করবেন না? না করলে তিনি নতুন বইয়ে বিনিয়োগ করবেন কীভাবে? প্রকাশকরা দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালান না, এটা মনে রাখতে হবে। প্রতিটা বইয়ে একজন সৎ প্রকাশক তার রক্ত পানি করা আয় বিনিয়োগ করেন। লেখকের রয়্যাল্টি দেয়ার পর আমাদের বেশিরভাগ বইয়ে দেখা যায় যা কিছু সামান্য আয় হয়, তা সেই বইটির পুনর্মুদ্রণে ব্যয় হয়ে যায়। প্রকাশক পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করছেন কিনা তাতেই নির্ধারিত হয় গ্রন্থের মান কেমন হবে।
লেখকের রয়্যালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এইক্ষেত্রে আপনার প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত বলবেন কি?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: এটা প্রকাশকের ন্যূনতম দায়িত্ব। প্রকাশকের সদিচ্ছা থাকলে বাকিটা আজকের দিনে খুব সহজ। আমি বরং লেখকদের বলবো আপনারা চুক্তি ছাড়া বই প্রকাশে রাজি হবেন না, আর প্রকাশকদেরকে দায়বদ্ধ করতে আপনাদের উদ্যোগ বেশি কার্যকর হবে।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কখনও কখনও নিজের অর্থায়ণে গবেষনা করিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে, এরফলে নূতন গবেষনাপত্রও তৈরি হয় এবং একইসঙ্গে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে- এটি নিয়ে আপনারা কখনও ভেবেছেন কি?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: তাহলে তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কোনো কাজ থাকবে না। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যে হেকেপ প্রকল্পে এত টাকা বিনিয়োগ করেছে, সেটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কী করবে! এইটা বরং ভেবে দেখেন। তবে এসব ফান্ডের কিছু অংশ প্রকাশকরা পেলে অবশ্যই তারা গবেষণাপত্র তৈরি করতে পারেন। কিন্তু সেই পরিমাণ প্রজ্ঞা ও দক্ষতাও তার থাকতে হবে। ইউপিএলে আমরা নিজেদের উদ্যোগে কিছু গবেষণামূলক বই হয়তো তৈরি করি, বা করতে লেখকদের উৎসাহ দেই। কিন্তু প্রকাশকের মূল কাজ হলো একটা গবেষণাকে গ্রন্থের রূপ দেয়া, সেটাও যথেষ্ট বিশেষায়িত একটা কাজ। যেকোনো পিএইচডি অভিসন্দর্ভ রাতারাতি ছাপা হয় না, তাকে পাঠকের উপযোগী করতে হয়। নিজের অর্থায়নে স্বতন্ত্র প্রকাশক হিসেবে গবেষণা করিয়ে তা প্রকাশ করে তার থেকে মুনাফা পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এই কারণেই বিশ্বব্যাপী ইউনিভার্সিটি প্রেসগুলি কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত থাকে। আমরা সেই জায়গায় ব্যতিক্রম।
দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ইউপিএল পূর্বের তুলনায় কতটা অগ্রসর প্রকাশনা জগতে?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: এটা আমাদের আন্তর্জাতিক বিক্রি দিয়ে খানিকটা বোঝা যেতে পারে। আগে বাংলাদেশ নিয়ে গবেষণার বই প্রকাশ মূলত ইউপিএল করতো। এখন বিশ্বের নামজাদা প্রকাশনা সংস্থার অনেকেই বাংলাদেশের গবেষকদের বই প্রকাশ করেন। কাজেই বলতে পারেন বিশ্বে বাংলাদেশের গবেষণা ইউপিএল-এর হাত ধরে জায়গা করে নেওয়ার পর অন্যেরাও বাংলাদেশকে নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কিন্তু এখনও দেশী-বিদেশী গবেষকরা ইউপিএল-এর বই কেনেন এবং ইউপিএলের সাথে কাজ করতে আগ্রহ দেখান, সেটা হয়তো আমাদের প্রাণশক্তির একটা নিদর্শন।
বাংলাদেশের প্রকাশনা জগত কীভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারবে-এরজন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলো কেমন হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: এটিও এমন এক প্রসঙ্গ যা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ দাবি করে। ১৮ কোটি মানুষের একটি দেশে প্রকাশনা কেন এখনও শিল্প নয়, সেই প্রশ্নের উত্তর পেলেই কী কী করলে এই সেক্টর শিল্প হিসেবে বিবেচিত হবে তার উত্তর মিলবে। সংক্ষেপে এ নিয়েও এইটুকু বলতে চাই যে, রাষ্ট্রকে প্রথমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। আর তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে দুর্নীতি দূর করে নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষাপদ্ধতি প্রণয়ন করা হবে, এবং সেই অনুযায়ী প্রকাশকদের বিকাশেও তাদের পাশে থাকতে হবে। এই মৌলিক বিষয়গুলিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারলে বাকিটা খুব সুদূর পরাহত হবে না।
সামনের দিনে ইউপিএল নিজেকে কীভাবে দেখতে চায়-সেটি আপনার ভাবনা থেকে বলবেন কি?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন: ইউপিএল তার ৫০তম বছরে পা রাখল ২০২৪-এ। অনেক উচ্চাশা যেমন আমাদের আছে এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে, তেমনই আমাদের লেখক-পাঠকদেরও অনেক প্রত্যাশা। আমরা বরাবরের মতো এই দেশের জ্ঞানের উৎপাদনে, জ্ঞানের বিকাশে পাঠকদের সাথে থাকতে চাই। টোকিওতে বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করেন এমন একজন প্রবীণ অধ্যাপকের বুকশেলফ ভর্তি ইউপিএল-এর বই দেখে আমাদের প্রাণ ভরে গিয়েছিল। আমরা চাই সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে-অর্থাৎ বাংলাদেশ নিয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে যারাই কাজ করেন, ইউপিএল থেকে প্রকাশিত বই তাদের জন্য হবে অবিকল্প। আর পাশাপাশি মাতৃভাষায় ভালো গবেষণাধর্মী বই প্রকাশে আমাদের প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ছাড়া আমাদের জাতীয় অগ্রগতি থমকে পড়বে নিঃসন্দেহে। তাই এই কাজে আমরা আমাদের লেখকদের অনুপ্রেরণা দিতেই থাকি। ওইযে রবি ঠাকুর শিখিয়েছেন - "বারেবারে জ্বালবি বাতি, হয়তো বাতি জ্বলবে না/ তা বলে ভাবনা করা চলবে না।"
সূত্র: অমর একুশে গ্রন্থমেলা ফেব্রুয়ারি ২০২৫ উপলক্ষে বেঙ্গল বুকস কর্তৃক প্রকাশিত বিষয়ভিত্তিক বিশেষ আয়োজন 'সাড়ে তিন দিনের পত্রিকা'র প্রকাশনাশিল্প সংখ্যায় সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হয়। প্রিয় পাঠক, সাক্ষাৎকারবিষয়ক স্বাধীন প্লাটফর্ম মুখোমুখি'তে এটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো। সাক্ষাৎকারটি ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে গ্রহণ করা হয়।
