কোনো কিছু মানি না— এই ধরনের শাব্দিক উচ্চারণ স্রেফ নৈরাজ্যবাদিতা : জ্যোতি পোদ্দার

 স্কেচ এঁকেছেন রিঙকু অনিমিখ


নব্বইয়ের দশক বাংলা সাহিত্যের জন্য ছিল এক অস্থির অথচ সৃষ্টিশীল সময়—প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যচর্চার বাইরে, ছোটোকাগজের পাতায় পাতায় জন্ম নিচ্ছিল নতুন ভাষা, নতুন ভাবনা, নতুন প্রতিরোধ। এই সময়েই নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর নিয়ে আবির্ভূত হন কবি জ্যোতি পোদ্দার। তাঁর কবিতায় যেমন ব্যক্তিগত বোধের গভীরতা, তেমনি আছে সময়ের অন্তর্লীন টানাপোড়েনের সূক্ষ্ম প্রতিফলন। ছোটোকাগজের সেই বিকল্প পরিসরই তাঁকে দিয়েছে পরীক্ষার স্বাধীনতা, ভাঙচুরের সাহস এবং নিজের ভাষা খুঁজে নেওয়ার সুযোগ।

এই সাক্ষাৎকারমূলক কথোপকথনে আমরা ফিরে দেখি সেই সময়ের সাহিত্য-বাস্তবতা— ছোটোকাগজের উত্থান, সমকালীন কবিদের পারস্পরিক প্রভাব, এবং প্রতিষ্ঠানের বাইরে দাঁড়িয়ে সাহিত্য নির্মাণের চ্যালেঞ্জ। জ্যোতি পোদ্দার এখানে কেবল নিজের লেখালেখির গল্পই বলেননি; তুলে ধরেছেন এক প্রজন্মের সাহিত্য-সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং বিবর্তনের ইতিহাস। 

কবি জ্যোতি পোদ্দার ১৯৭৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। নব্বই দশকের এই কবি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত আছেন। তিনি একাধারে লিখছেন কবিতা ও গদ্য বিশেষ করে প্রাণ ও প্রকৃতি নিয়ে। বইয়ের নাম: (a+b)2 উঠোনে মৃত প্রদীপ (১৯৯৭), সীতা সংহিতা (১৯৯৯), রিমিক্স মৌয়ালের শব্দঠোঁট (২০০২), ইচ্ছে ডানার গেরুয়া বসন (২০১১), করাতি আমাকে খুঁজছে (২০১৭), দুই পৃথিবীর' গ্যালারি (২০১৯)। 

১৯৭০-২০২০ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত শেরপুরের ছোটকাগজগুলো সংগ্রহ করে লিখেছেন 'শেরপুরের ছোটকাগজ চর্চা' শিরোনামে একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি। এছাড়া তিনি নিজের জেলা, ইতিহাস ও প্রকৃতিকে জানার নেশা থেকে জানাতে লিখছেন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায়। 

জ্যোতি পোদ্দারের প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ ভিন্নতর—যেখানে তাঁর কাব্যভাষার বিবর্তন ও চিন্তার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই কথোপকথন ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের সীমা অতিক্রম করে হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য-দলিল, যা নব্বইয়ের দশকের ছোটোকাগজ আন্দোলনকে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে। 

প্রিয় পাঠক, এই কথোপকথন বিভাগটি সাক্ষাৎকারের একটি রূপ। যেখানে ই-মাধ্যমে [ই-মেইল/হোয়াটসঅ্যাপ/মেসেঞ্জার/টেলিগ্রাম] চ্যাটিংয়ের মধ্যে আলাপচারিতা বা কথোপকথন হয়; হোয়াটসঅ্যাপে আমাদের এই কথোপকথন শুরু হয়েছিল পহেলা মে ২০২৬, সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ। জ্যোতি পোদ্দার-এর সঙ্গে কথোপকথনে অংশ নিয়েছিলেন— এহসান হায়দার।


শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াইয়ের দিন-আজ মে দিবস; চাই, সমস্ত শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণ হোক। এই দিন সৃষ্টিশীল মানুষদের জন্য কেমন তাৎপর্যপূর্ণ অথবা আপনি দিনটিকে কীভাবে অনুভব করেন?

জ্যোতি পোদ্দার : আমরা যে আয়োজনের ভেতর বেড়ে ওঠি—সেটি মূলত উৎপাদকের উৎপাদনের উপায়ের একটি হাতিয়ার হিসাবে। হোক সে-মেশিন কিংবা গতর। দু'টিই মালিকের আওতাধীন। শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই অন্যের হাতে প্রযোজিত হওয়া ছাড়া আমাদের নিস্তার নেই। মে দিবসের তাৎপর্য শুধু মাত্র আট ঘণ্টা সময়ের কাজ আর 'দুনিয়ার মজদুর এক হও' শ্লোগানের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। 

ঐকান্তিকভাবে দেহ ও মন নিয়ে মানুষ তার মর্যাদার পরিসর নির্মাণ করবে—সেটি আমরা পারি নাই। শ্রমিকের গতর খাটতে খাটতে সে হাড্ডিসার হয়েছে দেহে যেমন—তেমনি মনন ভূমির কর্ষণও হয়নি।

মালিক তার উৎপাদনের পুনঃপুনঃ মুনাফার হিসাবে স্ফিত হলেও, নিঃশেষিত হয়েছে শ্রমিক আর প্রকৃতি। শিল্প সমাজের মূল কাজই Matricide অর্থাৎ the killing of the Mother. সুতরাং এই আয়োজনে এই ভাবেই তো প্রযোজিত হবে। 

আপনার সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে মানুষের অধিকারকে কীভাবে দেখেন?

জ্যোতি পোদ্দার : জীবনের আরেক নাম সৃষ্টিশীলতা। হোক সে প্রাত্যহিক সংসার যাপন কিংবা কবিতা ও গান বা সাংবাদিকতা বা অন্যকোনো পেশা। সব কিছুই জীবনের আওতাধীন। আর মানুষ মানেই একক কোনো স্বাধীন সত্তা নয়—সে অপরাপরের উপর নির্ভর করে বিকশিত হয়। অপরের অধিকার ও বিকাশের পরিসর নির্মাণ ছাড়া একক মানুষ অধিকার চাওয়া সে মূলত অধিকার-চিন্তার পরিপন্থি। হোক সে শ্রমিক কিংবা নদী অথবা হাতি বা পাখি। প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব অধিকার ও স্বর। আমার সৃষ্টিশীলতা যাপনে কিংবা কবিতা রচনায় সে পরিসর নিয়ত নির্মানের প্রস্তুত থাকি।

আপনার প্রথম প্রকাশিত লেখা নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করবেন?

জ্যোতি পোদ্দার : আই লতা / মাই পাতা / মনে রেখো / মাই কথা

সেই কবে স্কুলজীবনে বন্ধুমহলে এসব করতে গিয়ে হাসি ও ব্যঙ্গবিদ্রুপের নিশানা হয়েছি আমি। বন্ধুরা যা করে গালাগালির সাথে গলাগলির পিরীতি। মূলত তখন থেকেই শুরু। স্কুলের দেয়ালিকায় লেখা জমা দিয়ে- যেদিন কাঁচাবাশের বেড়ায় টাঙানো দেয়ালিকায় আমার লেখা পদ্যখানি দেখলাম, সেদিন বন্ধুরা মুখটিপে হেসেছে বটে; কিন্ত আমার মনে যে ব্যথা পেয়েছিলাম সেটি ব্যঙ্গবিদ্রুপের কাছে নস্যি। সেই তো শুরু। তাই বলে ধারাবাহিক চর্চা চলেনি। চলেছে খেপে খেপে। কখনো লেখালেখি বন্ধ—এক্কেবারে বন্ধ। তারপরও আবার চলেছি...

বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি : সংগৃহীত 

ছোটো কাগজের মাধ্যমেই আপনার লেখার যাত্রা শুরু হয়েছিল যতদূর জানি, তখনকার ছোটোকাগজ চর্চার কিছু দায়-দায়িত্ব ছিল। লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে এবং কাগজকেন্দ্রিক নীতি থেকে- সেগুলো কেমন ছিল?

জ্যোতি পোদ্দার : পুরোপুরি সত্য নয়। একটু ভেজাল আছে। আমার জন্মজেলা শেরপুরে তিনটি সাপ্তাহিক ছিল—সাপ্তাহিক শেরপুর, সাপ্তাহিক দশকাহনীয়া আর সাপ্তাহিক চলতি খবর। এখানে নয়ের দশকের শুরুতে সম্পাদকত্রয় আমাকে এবং আমাদের যথেষ্ট পরিসর দিয়েছিলেন। উনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, লেখালেখির মাঠ কর্ষণে উনারা যথেষ্ট সহায়তা করেছেন। আর স্থানিক নানা ম্যাগাজিনে বিশেষ দিবসে দুয়েকটি লেখা ছাপা হয়েছে। জাতীয় দৈনিকে একবার মনে হয় ১৯৯৩ সালের দিকে। দৈনিক সবুজ বাংলা পত্রিকায়— পাটুয়াটুলি থেকে বের হতো—মূলত কেউ পড়ত না। শহরের নানা দেয়ালে সাঁটানো থাকত।

পরবর্তীতে ছোটো কাগজের পরিসরে ঢুকে পড়ি। সেও বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে। ছোটোকাগজ মাত্রই এক ঘাড় ত্যাড়া কৃশকায় তরুণ। তার ছন্নছাড়া বিচ্ছিন্ন জীবন থাকলেও থাকে দায়—সমাজের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতি সাহিত্যের প্রতি।

তার সময়ের ভাব ও ভাব চর্চায় পুরাতন ইশারাকে আক্রমণ এবং নতুন ইশারার আবাহন করা—যে কোনো ছোটো কাগজের নৈতিক দায়ও বটে। সেটি ছিল আমার সময়ে। তবে এসবের চেয়ে পারস্পরিক খেয়োখেয়ি যে কম ছিল তা কিন্তু নয়। বিরোধিতা করতে গিয়ে বিদ্বেষেও জড়িয়ে গেছি আমরা। আবার সব কিছু যে ভালোভাবে বুঝতাম তা কিন্তু নয়। বিচ্যুতিও ঘটেছে পদে পদে।

কেউ তড়িয়ে উঠেছে, কেউ ডুবে গেছে, কেউ সে সময়ের বানের জলের মতো কর্পোরেটের চাকচিক্য জাহাজে যাত্রী হয়ে গেছে।

সেটিও অস্বাভাবিক নয়—অন্নচিন্তা ও খ্যাতি কাউকে কাউকে পাগল করেছে। কেউ কেউ পড়েছিল আজিজ মার্কেট আর পিজির বটতলা আর পাবলিক পাঠাগারের লালসিঁড়ি আঁকড়ে। কেউ কেউ রাজধানীর চাপে-তাপে-ভাপে পালিয়ে ছিল ঢাকা থেকে। তাদেরই একজন আমি।

বাঙালির কবিতা শুরু হয় রবি-নজরুল-জীবনানন্দের প্রেমে পড়ে। আপনার এমন হয়েছিল কি?

জ্যোতি পোদ্দার : আমার বেড়ে ওঠা প্রান্তিকে। যাপন নিন্মবিত্তের ঘরে। সেখানে কয়েকটি ধর্মীয় পুস্তক ছাড়া অন্য কোনো বই খুব একটা ছিল না। পাঠ্য পুস্তকই পড়ি না—আবার 'আউট বই'। মূলত এমনই ছিল সেই সময়ে পরিবারগুলো মনোভাব। তার মানে অন্য বই পড়িনি তা কিন্তু নয়। তবে কবিতা নয়—পড়েছি উপন্যাস। পাশের বাড়ির বৌদির বিয়েতে উপহার পাওয়া বই। যেমন আকবর হোসেনের ''কী পাইনি'' ''অবাঞ্ছিত '' ছিল ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের কিংবা রোমেনা আফাজের নানা উপন্যাস। নিউজপ্রিন্টে ছাপা—পাতলা মলাট। আর কয়েকবার পড়েছিলাম বেদুঈন সামাদের ''ধুমনগরী'। মূলত এই বইটি পড়েই সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ি মাধ্যমিকের পর। আজকাল আর বইটি নিয়ে কোনো আলোচনা বা লেখকের নাম ধাম শুনি না। তবে আমাদের দু'চালা টিনের ঘরে ফ্রেমে ঝুলানো ছিল রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের ঝাঁকড়া চুলের ফটো। পাঠ্য বইয়েই তাদের কবিতা পড়া। আলাদা করে তখন আর পড়া হয়নি।

তবে প্রাথমিকে আমাদের বাংলা পাঠ্য বইয়ে একটি ছবি—একদিকে সূর্যে উঠছে নিচে একটা উদোম ছেলে দুহাতে বুক ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে। চুল উষ্কখুষ্ক—বই খুলতেই চোখ আটকে গেলো। নতুন ক্লাশ নতুন বই। সাদা অফসেট কাগজে ছাপা বইয়ের গন্ধও অসাধারণ। কবিতার নাম 'প্রার্থী'—লিখেছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। 

সেই প্রথম সুকান্ত ভট্টাচার্যের নাম জানা। কবিতা মুখস্থ করা। এমনকি মাধ্যমিক পাশের পর আমি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা বই প্রথম কিনি। তার কবিতাতেই মশগুল থাকতাম। নানা অনুষ্ঠানে আবৃত্তিও করতাম গলা ভরাটের ভাব করে। তবে কখনো পুরস্কার পাইনি।

কলেজে উঠে গণি আদম চৌধুরী'র পাল্লায় পড়ে ছাত্রফ্রন্টের সন্মেলনে যাওয়া, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বই পড়া কর্মসূচীতে বই পড়া—শুধু বই পড়া নয়—ভালো লাগা লাইন বা অনুচ্ছেদ তুলে রাখা ও শুক্রবার সকালে বই আনতে মুসলিম ইনস্টিটিউটে গিয়ে কেন লাইনটি ভালো লেগেছ তা বলা কওয়ার ভেতর দিয়েই মূলত আমার পাঠ্যাভ্যাসের যাত্রা শুরু। আর বগলে এক গাদা বই নিয়ে ক্যাম্পাসে হাঁটা আর আঙুল দিয়ে বারবার চুল ভাঁজ করা তখনই শুরু।

সে সময়ে গঠন করি 'ফুলকি' সজল কোরায়শির প্রযত্নে। কী ভারী গালভরা শ্লোগান 'ফুলকি থেকে জ্বলবে আগুন টলবে আসন শোষকের' পাতলা কাগজে লিখে সেঁটে দিচ্ছি আনন্দমোহন কলেজের দেয়ালে দেয়ালে। যোগ দিন ফুলকিতে। ফুলকি একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। লেখা জমা দিন। বের হচ্ছে 'দর্পণ' ফুলকির প্রথম দেয়ালিকা।

এসব-ই সুকান্তের ভেতর বেড়ে ওঠা আমার কলেজ জীবনের নানা তৎপরতা—সুকান্তের প্রযত্নে সুকান্তের নিশানাকে আমার নিশানা করে কবিতার দিকে যাত্রা।

'দুই পৃথিবীর গ্যালারি' বইয়ের প্রচ্ছদ 

কবিতার কথা শুরু করি, আপনার শুরু ছিল কবিতায়- তা আজকের দিনে এসে কী দেখছেন?

জ্যোতি পোদ্দার : তবে সুকান্তের ঘরে আমার আর থাকা হলো না—পালা বদল ঘটে গেলো। বৃহস্পতিবার দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িক পাতা আর এরশাদ পতনের পর 'আমার চোখ বাঁধা নেই আমি দেখতে পারি।'' শ্লোগানে প্রকাশিত ''আজকের কাগজ'' এর ভক্ত হয়ে গেলাম। সংবাদ ও ইত্তেফাকের চেয়ে আলাদা গড়ন—আলাদা ভাষা আলাদা কলাম অনেকের মতো আমিও আজকের কাগজ পড়ি। সম্ভবত তাদের একটা ম্যাগাজিনও ছিল সাপ্তাহিক। সেখানেই আহমেদ শরীফ স্যারের লেখার সাথে পরিচয়।

ক্লাসের পড়া আর হচ্ছে না। ক্লাস করি বটে। ক্লাসে থেকেও থাকি না। কবিতা আর পড়ি না। মানে পড়া হয় না। ইতোমধ্যে শিল্পকলায় যোগ দিয়েছি নাটকের ক্লাসে। নব গঠিত স্টার থিয়েটারে ভিড়ে গেলাম। বিকাল থেকে চলছে জনৈকের মহাপ্রয়ান বা বিদ্রোহী পদ্মা নাটকের রিহার্সাল। কবিতা নয়—নাটকই সমাজ বদলের হাতিয়ার এমন ভূত ততদিনে মাথার ভেতর বেশে জে্ঁকে বসেছে।

তবে রোকেয়া ম্যাডামের ক্লাস করি। ভারি সুন্দর করে লালসালু পড়াতেন। কী দারুণ উচ্চারণ। বিস্ফারিত চোখ লিকলিকে গঠনের ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার চোখে তখন ঘোর। পরিপাটি করে শাড়ি পরেন। ছোটো ছোটো বাক্যবৃষ্টিতে পুরো ক্লাস ভিজে যায়। আমি তার ক্লাস করি আর ছিপছিপে গড়নের মুখে একগাল দাঁড়ি নিয়ে ফর্সা এক ইংরেজি স্যারের ক্লাস। নাম মনে নেই। তিনি এসেই পড়ালেন A frosty night. চোখ বন্ধ করে একটু ঝুঁকে আউড়ে যাচ্ছেন কবিতা। লাইনের পর লাইন বলছেন, তার ইংরেজিতে ব্যাখ্যা করছেন। আমাদের মাথার উপর দিয়ে ইংরেজি চলে গেলেও তার সুর ও স্বর আমাকে বিহ্বল করে রাখল।

কবিতা পাঠ করতে করতে যখন- 

Your eyes were frosted starlight,

Your heart, fire, and snow.

Who was it said 'I love you?'


Alice: Mother, let me go!

তখন আমি আর আমাতে নেই। ক্লাসে থেকেও আমি নেই। আমি নেই হয়ে আছি যেন। তারপরও কবিতা থেকে দূরে—অনেক দূরে। শুধু মনে বাজে স্যারের উচ্চারিত সুর আর স্বর। বছর খানেক পর আবার কবিতায় ফিরে এলাম সাতকাহন দুই খন্ড আর সুনীলের প্রথম আলো'র দুই খণ্ড পড়ার পর মৈত্রেয়ী দেবীর ন হন্যতে পড়ার ভেতর দিয়ে— মির্চা, মির্চা আই হেভ টোলড মাই মাদার, ইউ ভেভ ওনলি কিসড মি ফোরহেড পড়ার মধ্যে দিয়ে শামসুর রাহমান আর সুনীলের নীরার হাত ধরে।

তারমানে রাজনৈতিক হাওয়াও লেগেছিল কলেজ জীবনে। আচ্ছা কবিতার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক আছে কি এদেশে, নাকি কবি রাজনৈতিক-দলকানা হয়ে যায় শেষাবধি?

জ্যোতি পোদ্দার : কলেজে প্রেম ও রাজনীতি পাশাপাশি হাত ধরে এসেছিল। যদিও সে প্রেম—আমরা বলতাম ওয়ান সাইডেড লাভ এ্যাফার। দূর —তিনি দারুচিনি দ্বীপের বাসিন্দা। তবে রাজনৈতিকতা বেশ ভেতরে ঢুকে গেছে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে কিনছি লেনিনের বই রাষ্ট্র কী, রেবতী বর্মনের বই, রাজনীতি অ আ ক খ, ছোটদের অর্থনীতি, যে গল্পের শেষ নেই। যদিও দোকানটি আজ আর নেই। বিদ্যাময়ী স্কুলের পাশের গলির মুখে দোকানটি ছিল। মূল্য আর কত? ১০/২০ টাকার মতো। যদিও তখন হুমায়ুন আহমেদ পড়ি। ইমদাদুল হক মিলন পড়ি আর পড়ি সেবা প্রকাশনির বই। 'শি' 'রিটার্ন অব শি" নানা রহস্য আর গোয়েন্দা বই।

অবশ্যই রাজনৈতিকতা থাকা জরুরি। রাজনৈতিকতা ছাড়া কোনো নির্মাণ খাড়া হয় না। ভাঙচুরের জন্য যেমন রাজনৈতিকতা জরুরী তেমন নির্মাণের জন্য। সমাজকে চোখে দেখা থেকে দেখার চোখের দিকে রূপান্তর ঘটায় রাজনৈতিকতা। এই দিক থেকে দেখলে কবিতা-গান বা ছড়ার সাথে রাজনীতির সম্পর্ক আছে—থাকতে হয়। নইলে ঢোঁড়াসাপ। 

কিন্ত দলীয় প্রভাব বলয়ে কবি বা লেখকের বাস মূলত বন্দিত্বের বাস। কর্তার ইচ্ছায় কেত্তন করতে করতে জীবন যায়। নিজ দলের মতাদর্শে মশগুল থেকে তার চোখ ও বিবেক মূলত পশ্চাৎগামী হয়। গুণগানের মহিমা প্রচার বা বলা চলে বিজ্ঞাপন সাহিত্য নির্মাণ করা ছাড়া তার আর কোনো পথ থাকে না। দলকেন্দ্রীয় কবি বা লেখক মূলত স্তুতিগাথা গাইবার নিজস্ব শব্দ-বাজিগর-বাহিনী।

'সীতাসংহিতা' বইয়ের প্রচ্ছদ 

এন্টি-এ্যাস্টাব্লিশমেন্ট বা প্রতিষ্ঠান-বিরোধীতা পছন্দ করেন আপনি? ছোটোকাগজে যারা একদা একটা লক্ষ্য নিয়ে লিখতে শুরু করেন, কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর সে লক্ষ্য তাদের থাকে না- হয়ত তখন কারো কারো লক্ষ্য বদলে যায়। আসলে ছোটোকাগজের যে নানামুখী চিন্তা-তর্ক তা কি শেষাবধি লেখককে আর ধরে রাখতে পারে না?  আচ্ছা, আশির দশকে একটা কবিতার ইশতেহার লিখেছিলেন কতিপয় ছোটোকাগজকর্মী; তারপর কী ঘটেছিল, বাংলাদেশের কবিতায় কতটা বদল এবং নতুনত্বের দেখা পেলেন?

জ্যোতি পোদ্দার : এন্টি এ্যাস্টাব্লিশমেন্ট একটি লোভনীয় শব্দগুচ্ছ। এ্যাস্টাব্লিশমেন্ট শুধু একটি ইট পাথরের তৈরি একটি কাঠামো নয় বরং প্রচল চিন্তার মূর্তরূপ। সেই মূর্তরূপের ধারক বাহক ও বিজ্ঞাপিত স্থিতিস্থাপককে পর্যালোচনা ও একটি অবিকল্প বোধের নতুন চিন্তার আর্বিভাবকে পরিসর দেয়ার নাম এন্টি এ্যাস্টাব্লিশমেন্ট। সেটি যেমন চিন্তায় তেমনি বাক্যে তদুপরি যাপনে ফুটিয়ে তোলা।

শুধুমাত্র সাড়ে তিন পাতার কাগজ করলাম মাঝে আর পরস্পরের নানা কায়দায় কথার বুদ্বুদের হাওয়া তুলে পরিবেশকে অস্থির করে তুলে, বললাম আমি এন্টি এ্যাস্টাব্লিশমেন্টের পক্ষের লোক। এমন ভাব ও ভাবনার নাম ছোটোকাগজ নয়। 

কোনো কিছু মানি না— এই ধরনের শাব্দিক উচ্চারণ স্রেফ নৈরাজ্যবাদিতা। কোনো কিছু মিন করে না। কোনো প্রভাব ফেলে না বরং সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। আবার সবই মানি সেটাও এক ধরনের মৌলবাদিতা—জলাবদ্ধ ময়লা পুকুরে হাবুডুবু খাওয়া। 

'অচলায়তন'কে চিহ্নিতকরণ করে 'মুক্তধারা'র স্রোত-প্রবাহকে জারি রাখার পরিসরের নাম ছোটোকাগজ। এই চিন্তার লড়াই নিয়ত লড়াই। সেই লড়াইয়ের কাজটি সঠিক পথ ও মত মতো হয়েছে কিনা, তা চট করে বলবার সুযোগ কম। দরকার অবজেক্টিভ অনুসন্ধান। তথ্য ও তত্ত্বের সুলুকসন্ধান এবং তা প্রকাশে কতটুকু উন্মোচিত হয়েছে তার পর্যালোচনা। এটি স্বাধীনতার পর আমরা করিনি, বা করতে পারিনি।

যে যতটুকু অচলায়তনকে উপলব্ধি করতে পেরেছে ততটুকুই মুক্তধারার পরিসর নির্মাণের পরিসর পেয়েছে। এই উপলব্ধি নিয়ত—যত উপলব্ধ তত মুক্তধারা। এই বন্ধুর পথে কেউ কেউ সরে পড়েছে, কেউ কেউ আছি বটে ভাবছি,কিন্তু কার্যত নেই। তবে উন্মুখ চোখ যতদিন থাকে ততদিন তিনি শারীরিকভাবে থাকেন—মনন ভূমি কর্ষণ করতে থাকেন। কেউ শুধু বীজ নিয়েই বসে থাকেন—'দেখিস একদিন আমিও''। তার আর সৃজনকর্ম হয় না। তিনি গজদন্ত মিনারবাসি। 

'জানালার পর্দা টেনে দাও—প্রান্তরে কিছু নেই'' ভাববিশ্ব নিয়ে পড়ে থাকেন শ্রুতি ও স্মৃতিতে। মুক্তধারায় কোনো প্রভাবই আর তার থাকে না—কেবলই স্মৃতি-জাবর কাটা। অতীতমুখীতাই তার দিশা হয়ে যায়। সেও প্রচল চিন্তার মূর্তরূপ।

এই যে অচলায়তন ও মুক্তধারা লড়াই এই লড়াই চিরকালিন। অনেকটা অনাবাদি জমি থেকে আবাদি জমির দিকে যাত্রা—অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পরিভ্রমণের পর্যালোচনা করা, তত্ত্বায়ন করা আর তার প্রয়োগে নানা কর্মকুশলতা উদ্বোধন করা। সেটি মূলত অকালবোধনই হয়। কেউ মানতে চায় না।অর্থমূল্য (Meaning & Money) দিতে অনাগ্রহী শুধু নয়, বরং জগদ্দল পাথরের মতো সামনে এসে দাঁড়ায়। অচলায়তনের এই এক অনিবার্য ক্রিয়া—এ কাজ করা ছাড়া তার যে আর কোনো পথ নেই। তবে তার ভবিতব্য এই যে নতুনের কাছে মুক্তধারার কাছে তার পরাজয়— পুরাতন স্মৃতি হয়ে জাদুঘরে চিরনিদ্রায় বাস তার নিয়তি।

যে নতুন 'কেতন' উড়িয়ে পুরাতনকে বিধ্বস্ত করেছে একদিন সেও ভুলে যায় নিয়ত নতুন চিন্তার বোধনের কথা—কালে কালে সেও স্থিতির পক্ষে পুরাতনের পক্ষে ওকালতি করা শুরু করে। সেও নতুন কাল ও স্থানে অচলায়তনের স্থান দখল করে। এই লড়াই নিয়ত। মূলত নতুন প্রতিষ্ঠা পেয়েই অচলায়তনের পোশাক পরে নেয়।

ক্লোরোফিল সঞ্চিত পাতার অনুপল খেয়েই পোকার জীবনচক্র। পাতার স্বাদ নিতে নিতে এক সময় পাতা শুকিয়ে যায়। ঝাঁঝরা হয়ে ওঠে। আর সেখানে থাকা তার জীবনের জন্যও হুমকি। তার দরকার নতুন পাতা; কিন্তু পাতার নিকটে বেড়ে ওঠা বাতাস ও আলোতে ভরা আরেকটি পাতা কাঁপছে নিয়ত। ভরা যৌবনা তিনি। পোকা সেদিকে যেতে চায়। কিন্তু পারে না—ছোট্ট একটি শরীর নিয়ে কিভাবে সে কম্পিত পাতাকে ধরবে? 

অথচ তারও তো বেঁচে থাকতে হয়—হবে। তারও অধিকার আছে জীবনচক্রে অংশ নেওয়ার। তার এই অসহায় ও সংকটময় জীবনে প্রকৃতিও দিয়েছে পথ বাতলে। সে তখন তার ছোট্ট শরীরে ছোট্ট জিব্বাহ বের করে কম্পিত পাতাটা ধরে ফেলে। যতটুকু ধরে ফেলে ততটুকু পেছন দিক দিয়ে ছেড়ে দেয়। যতটুকু মুক্তধারা ধরে ততটুকু অচলায়তনকে ছেড়ে দেয়। নতুনের দিকে এগিয়ে যায় অন্যদিকে পুরাতনকে পরিত্যাগ করে—করতে বাধ্য হয়—জীবনের তাগিদে।

এই অচলায়তন ও মুক্তধারা চক্র আমাদের জীবনেরই চক্র। ছোটোকাগজ এই পরিসরের বাইরে নয়।

আচ্ছা, ডিজিটাল যুগে ছোটোকাগজের ভবিষ্যৎ আপনি কীভাবে দেখছেন?

জ্যোতি পোদ্দার : আমরা মূলত এখন সিটিজেন থেকে নেটিজেনের দিকে ঝুঁকে পড়েছি। কান পাতলেই শুনতে পাই কি রে তোকে আজকাল ফেবুতে দেখি না। নয়ের দশকে বলতে শুনেছি কি রে তোকে তো আজিজে আজকাল দেখি না! আগে আমরা খুঁজতাম এ্যাকচুয়াল প্রেজেন্স এখন খুঁজি ভার্চুয়াল প্রেজেন্স।

এই প্রবণতা কালের ধর্ম। আমি চাই বা না চাই—কালের ধর্মের অধীন হওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই। ছোটোকাগজ ইতোমধ্যে প্রিন্টিং ভাষ্য থেকে আন্তর্জালে আশ্রম খুলে বসেছে দেশে দেশে। বাংলা কবিতার ওয়েবম্যাগের সংখ্যা নেহাত কম নয়—শতেক ছাড়িয়েছে। ছোটোকাগজের পুরাতন পোশাক তাকে ছাড়তেই হবে—এ তার অনিবার্য পরিণতি।

'রিমিক্স মৌয়ালের শব্দঠোঁট' বইয়ের প্রচ্ছদ 

পাঠকের প্রতিক্রিয়া আপনার লেখায় কতটা প্রভাব ফেলে?

জ্যোতি পোদ্দার : প্রশ্নটি সহজ—উত্তর জানি না। বহু বছর আগে কবি রথো রাফি আমার 'রিমিক্স মৌয়ালের শব্দঠোঁট'' নিয়ে হাজার চারেক শব্দ নিয়ে একটি আলোচনা করেছিল। আবার এই কিছুদিন আগে উত্তরপর্ব কাগজে মঞ্জু রানী দাস আমার লেখালেখি নিয়ে প্রায় এক ফর্মা আলোচনা করেছেন। খুশি হয়েছি। দুই জনেই নানা দিক দিয়ে আক্রমণ করেছেন। আক্রমনের ধরন ও প্রভাব নিয়ে পড়েছি।ভাবিনি। আর কেউ কথা বলেছেন কিনা জানি না। কেননা পাঠকের কাছে আমি ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারিনি—সেই দায়ভার আমার।

আপনি শেরপুরে থেকে শিক্ষকতা করছেন, একইসঙ্গে সাহিত্যচর্চায় নিমগ্ন- ঢাকা শহরের বাইরে থেকে এই চর্চাতে কোনো বাঁধা বোধ করেন কি?

জ্যোতি পোদ্দার : ঢাকা বাংলাদেশ নয়—বাংলাদেশের অংশ। রাজধানী বলেই কিছু বেশি সুবিধা যে আছেই সেটা মানতেই হবে। তার মানে ঢাকা কেন্দ্র নয়। কেন্দ্রকে মান্যতা দিলে ঢাকার বাইরে সব—সব কিছু পরিধির প্রান্তে একটা মফস্বল মফস্বল ধারনার জন্ম নয়। কেন্দ্র—প্রান্তের ধারনা ঔপনিবেশিক ধারনা প্রসূত।

প্রতিটি স্থানিক পরিসরে নানা ভাব ও ভাবনা ভাষিক চরিত্রের ভেতর বিদ্যমান। রয়েছে বৈচিত্র্যের সমাহার। প্রতিটি স্থানিক অনন্য। আর স্থানীয়তার চর্চা ব্যতিত একটি দেশের নানা বৈচিত্র্য ফুটে ওঠে না। হোক শেরপুর বা নোয়াখালি বা পিরোজপুর অথবা হবিগঞ্জ। স্থানিক চরিত্রের অনুসন্ধান ও তার পর্যালোচনা আমি জরুরি মনে করি।তাছাড়া www.com যুগের নেটিজেন হয়ে কেন্দ্র কে? ঢাকা কে?

সবই তো একের সাথে অপরের সংযুক্ত জীবন। এখানে দূরত্ব ইজ ইক্যুয়াল টু জিরো। রবি ঠাকুর থেকে ধার করে বলতে পারি- 'সবার সাথে আমার অবারিত যোগ আছে।"

আপনার প্রতিবেশ কীভাবে লেখক হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে, যেখানে লেখার চিন্তা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতা—এর কোনটি লেখায় বেশি প্রাধান্য পায়?

জ্যোতি পোদ্দার : উৎপাদন ব্যবস্থাই উস্কে দেয় উপরিকাঠামো। এখানে কেউ একা নয়—বরং একে অপরের সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের গণিতে বাঁধা। যেমন তার অবকাঠামো তেমনি তার উপরিকাঠামো। উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করে করেই মূলত সৃজনশীলতার পরিসর গড়ে ওঠে। উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে ব্যক্তি ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়াই আমাকে আমার লেখার দিকে নিয়ে যায়; কিন্তু পারি না—আমার দেখবার চোখ গভীরে প্রবেশ করে না— কাজেই আমার লেখার পরিসর থাকে বিশৃঙ্খলা ও অগভীর। কোনো মিনিং উৎপাদন করতে পারি না। এটি আমার ব্যক্তিগত পরাজয়।

সমসাময়িক কবিবন্ধুরা আমার কাছে ফুয়েল স্টেশন। সে হোক কবি রথো রাফি বা সুহৃদ শহীদুল্লাহ্, আহমেদ নকীব—বা শওকত হোসেন বা আরো যারা জারি রেখেছেন তাদের কর্মতৎপরতা। সব সময় যে পড়তে পারি তা কিন্তু, নয়। আবার গভীর স্টাডি করতে পারি তা নয়। তবে ফুয়েল স্টেশনে থামি। দূর থেকে দেখি। আরে ওরা কী সুন্দর লিখছে অথচ—আমার চলছে রাইটার্স ব্লক!

 

এই যে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে নিয়ে পোলারাইজেশন- এটি যত না সাহিত্যিক মনোভঙ্গি তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক মনোভঙ্গি। বলা ভালো গোষ্ঠীগত রাজনৈতিকতার পোশাকে মোড়ানো।


আমাদের সামগ্রীক সাহিত্যে যে উন্নতি সম্ভব ছিল স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সেটি এখন এসে দেখা যায়, শূন্য ভাঁড়ার- বিষয়টিকে আপনি কেমনভাবে পরিলক্ষিত করেন?

জ্যোতি পোদ্দার : এই পর্যালোচনা করার জন্য যথেষ্ট উপাত্ত আমার হাতে নেই। গড়ভাবে একটা মন্তব্য করা যেতেই পারে, কিন্তু তা হবে অবিবেচনা ও অজ্ঞাত প্রসূত। শূন্য—না পূর্ণ তা পর্যালোচনা সাপেক্ষ। দালিলিক উপাত্ত জরুরি—জরুরি কোন লেন্স দিয়ে দেখছি তা ঠিক করা। 'সামগ্রিক সাহিত্য'' দেখবার চোখ একরৈখিক নয় বরং দরকার বহুরৈখিক—বহুস্তরীয়।

কথাসাহিত্য, কবিতা কিংবা গল্প কোনধারাটি আপনার নিকট বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে গত তিন দশকে, যেখানে নতুন কিছু পেয়েছেন আপনি?

জ্যোতি পোদ্দার : আমি মূলত পাঠক—পড়তে ভালোবাসি। কবিতা বা গল্প বা উপন্যাস পড়ি। আনন্দের জন্যে পড়ি। লেখকের লেখার ভেতর যে জার্ণি তার সহযাত্রী হিসাবে থাকতে ভালো লাগে। আনন্দ ছাড়া অন্য কোনো কিছু সন্ধান করি না। করতে ভালো লাগে না। 'নতুন কিছু ' পেয়েছি কিনা—এটি বলা কষ্টকর। কোনো উপাত্ত হাজির করতে পারব না। আনন্দযজ্ঞে মেতে ওঠাই আমার স্বভাব।

কে বিশেষ আপনার কাছে, শামসুর রাহমান নাকি আল মাহমুদ?

জ্যোতি পোদ্দার : বিশেষ বলা মানেই অপর প্রান্তে অন্যকে ফেলে দেয়া। এই যে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে নিয়ে পোলারাইজেশন- এটি যত না সাহিত্যিক মনোভঙ্গি তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক মনোভঙ্গি। বলা ভালো গোষ্ঠীগত রাজনৈতিকতার পোশাকে মোড়ানো। তাই বলে কী কবি আল মাহমুদকে পড়ব না? পড়ব আরো বেশি করে। তাঁর রাজনৈতিকতা বোঝার জন্য পড়ব। তাঁর লেখার সাথে বাহাস করার জন্য পড়ব। তাঁর বিরোধিতা করার জন্য পড়ব। তাঁর কাব্যে স্নাত হবার জন্য পড়ব। তাঁর কালের কলসও পড়ব—সোনালি কাবিন পড়ব—পড়ব বাখতিয়ারের ঘোড়া।

'কবুল'—বৈবাহিক বন্ধনে একটি ধর্মীয় শব্দ। কবুল বলার সাথে সাথে দুটি দেহ দুটি প্রাণ—এক ও অভিন্ন হয়ে যায় সংসার যাপনে, আল মাহমুদ কবিতায় উল্যেখের আগে থেকেই শব্দটি হাজির ছিল। তার কৃতিত্ব এই যে কবুল বলার আগে কবুল বলার সময় একজন নারী যখন অপরিচিত পুরুষকে বাহুলতার মতো বাঁধতে যাচ্ছে তখন সেই নারীটির মনের উথালি-পাতালি মনের ভাঙা-গড়ার যে মনোল্লাস তা তো আল মাহমুদ ছাড়া আর কোনো কবি এই তথ্যটুকু হাজির করেন নি। এই যে নতুন চিহ্নের আর্বিভাব—নতুন স্বর ও সুরের গান তা তো বাংলা সাহিত্যকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে।

একই সাথে তার গোষ্ঠীগত অবস্থান নিয়েও আমরা কথা বলতে পারি। একই কথা শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রেও। সেখানেও আমরা নানা চিহ্নের সমাহার পাব—কিন্তু না পড়ে নয়।  

আপনি কবিতা লিখতে পছন্দ করেন যেমন, পড়তে কেমন ভালো লাগে, কাদের লেখাকে সময় নিয়ে পড়েন?

জ্যোতি পোদ্দার : কবিতা পড়ি। কবিতা লিখিও বটে। তবে খুব ভদ্রভাবে স্বীকার্য যে ' শ্রীমান জ্যোতি পোদ্দারের লেখাজোকা খুব একটা হয় না। অভদ্রভাবে বললে, বলা চলে তার লেখালেখি বন্ধ করে দেয়া উচিত। আমার পাঠক সত্তা ও কবি সত্তা পরস্পরের ঝগড়াঝাটির কথা আমি ভাগে ভাগেই বলে রাখলাম। 

কবিতা পড়ি—হোক সে বন্ধু কবি বা অপরিচিত। নিয়মিত পড়ি না এটা হলফ করে বলা যায়। পড়ি Les Murray। মানে আজকাল পড়ি। খেই ধরে রাখতে পারি না। তার লেখার অরণ্যে হারিয়ে যাই। তখন একটু নিস্তারের জন্য পড়ি David Hinton এর অনুবাদে পড়ি Mountain Home—The wilderness poetry of ancient china. একটু মাথা ঠাণ্ডা হয়। আবার যখন Seamus Heaney খুলে বসি—কিন্তু দাঁত ভেঙে যায়। টেবিলেই পড়ে থাকে। আবার Joy Harjo খুলি। এখানে বেশ লাগে। আনন্দ পাই। নতুন এসেছে Lena khalaf Tuffaha এর water & salt প্যাকেট খুলিনি ভালো করে। North point North উল্টাই বটে এতো দীর্ঘ বাক্যে মন বসাতে পারি না। john koethe সবাই তার নামধাম নেই। সে হিসাবে কিনেছিলাম—পড়া হলো না। এই তো এদের নিয়ে থাকি। বুঝি না—তবু এদের নিয়ে থাকি।