লেখার মধ্যদিয়ে সমাজ পরিবর্তনে আমরা সরাসরি যুক্ত ছিলাম— আখতার হুসেন
![]() |
| শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন [ফাইল ছবি] |
আখতার হুসেন ছড়াকার, গল্পকার এবং অসামান্য গীতিকার। জন্ম- ১ নভেম্বর, ১৯৪৫ সালে নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং অগ্রণী ব্যাংক শিশু একাডেমী শিশুসাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। গদ্য-পদ্য মিলিয়ে প্রকাশিত বই ৬০-এর বেশি। ও হাওয়া ও হাওয়া, সেই যে আমার প্রাণের মিতে নদী, রিমঝিম আর পরিদের দেশে যাবে না, কুট কুট কুট্টুস ফুট ফুট ফুট্টুস, আমার দুটো ডানা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তারই লেখা গান প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন’-এর সংগঠন সংগীত। গুণী এই শিশুসাহিত্যিক কথা বলেছেন শিশুসাহিত্যের নানান বিষয় নিয়ে, এ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার শিশুসাহিত্যবিষয়ক সামগ্রীক ভাবনা। সাক্ষাৎকারটি গ্রহন করেছেন—এহসান হায়দার
আপনার শিশুসাহিত্য চর্চার শুরুর সময়টা কেমন ছিল?
আখতার হুসেন : আমি বড়দের সাহিত্য দিয়ে শুরু করি এবং তাঁর পরেই আমি নিজেকে ডায়ভার্ট করি রূপকথা লেখার দিকে। ছড়া লেখার দিকে। তারপরেই আমরা গফরগাঁও থেকে বদলি হয়ে আসি শ্রীমঙ্গলে, সেখানেও এসে ছড়া লিখি পত্রিকায় পাঠাই কিন্তু ছাপে না। এরপরে আমি যখন কুলাউড়াতে চলে আসলাম, তখন একটা লেখা পাঠালাম অর্ধ-সাপ্তাহিক বাংলা নামক পত্রিকায়। আবদুল গাফফার চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো, পত্রিকারটার ছোটদের পাতা দেখতেন দাদুভাই(রফিকুল হক)। আমার লেখাটা পাঠানোর ঠিক পরের সপ্তাহে ছাপা হয়ে গেলÑ এইত্ত আমি এবারে দুই হাতে ছড়িয়ে লিখতে শুরু করে দিলাম। আমার বন্ধুবান্ধব যারা ছিল তারাও খুব আনন্দিত হলো। তারপরে আপনার এই যে ছড়া লেখা শুরু করলাম আর থামিনি। এরপর থেকে আমার শিশু-সাহিত্য লেখা শুরু হয়ে গেল। বড়দের জন্য লেখা গল্প এবং আরও যে-সব লেখা ছিল তারও কিছু কিছু ছাপা হতে আরম্ভ করল। যেমন আমি প্রথমেই বলেছি আমি বড়দের গল্প লিখতাম পাঠাতাম কিন্তু ছাপা হতো না; কিন্তু মায়ের নাম আয়েশা আর আমার নাম আখতার মিলিয়ে আয়েশা আখতার নামে দুটো গল্প পরপর পাঠালাম দৈনিক ইত্তেফাকের মহিলা পাতাতে। গল্প দুটোই পরপর দুই সংখ্যাতে ছাপা হলো। ছোটগল্প লেখাটা ওইখানেই স্টপ থাকলো। যখন ছড়া ছাপা শুরু হলো তখন ছড়া লেখার উপরেই গুরুত্ব দিতে থাকলাম।
আপনার মনে পড়ে সেই সময়ের শিশুসাহিত্য যারা চর্চা করতেন, বড়রা কেমন ছিলেন?
আখতার হুসেন : বড়রা খুবই আগ্রহ নিয়ে আমাদের লেখা পড়তেন, কী লিখছি জানতে চাইতেন। যেমন বলতে পারি এখানে, ১৯৬৪ সালের দিকে বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্য নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখলেন আতোয়ার রহমান সাহেব, উনি গবেষক এবং শিশুসাহিত্যিক। উনার রূপকথার বই আছে, গল্পের বই আছে খুব সুন্দর ভাষায় লেখেন এবং অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ উনি। ওনার সেই প্রবন্ধে যত ছড়াকার আছেন সবার ছড়া কোট করছেন। সবারটা করছেন দুয়েক লাইন করে, কিন্তু আমার ছড়াটা পুরোটা কোট করলেন তিনি। আমি দেখে অবাক হয়ে গেলাম। তখনো আমি ঢাকায় আসিনি মফস্বলে থাকি, প্রবন্ধটা ছাপা হয়েছিল দৈনিক আজাদে। তখন দৈনিক আজাদের পাতাটা দেখতেন কবি হাবীবুর রহমান, যিনি খেলাঘরের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। সত্যিই আমি আতোয়ার রহমান ভাইয়ের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। আমি খুবই কৃতজ্ঞ রফিকুল হক দাদুভাইয়ের কাছে। তিনি আমাকে যে পরিমাণ প্রশ্রয় দিয়েছেন। শিশুসাহিত্য ছাপা হওয়ার পর থেকে আমার ছোটগল্প, ছড়া বা যা-ই হোক ছাপার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। এটাই হলো আমার প্রাথমিক সময়। আর সেই সময়ের শিশু সাহিত্যের কথা যদি বলেন তাহলে আমি একটা কথা বলব। তখন যারা ছোটদের পাতা দেখতেন তারা প্রত্যেকেই ছিলেন অভিজ্ঞ। নিজেরা লেখালেখি করতেন। সেসময়ে অনেক ভালো ভালো পত্রিকা হয়েছে- রংধনু নামে একটা পত্রিকা ছিল, কচি ও কাঁচা ছিল আরও অনেক পত্রিকা ছিল অগ্রপথিক হিসেবে কাজ করেছে অনেকে কিন্তু প্রধান ছিলেন তিনজন। রফিকুল হক দাদুভাই, হাবীবুর রহমান আর মো. মোদ্দাবের হোসেন। আর জেবু আহমেদ সেই সময় বের করতেন জোনাকি নামে একটা পত্রিকা।
শিশুসাহিত্য চর্চায় আপনার প্রেরণা কারা ছিল?
আখতার হুসেন : বাবা প্রেরণা দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। আমি যখন লেখালেখি শুরু করি তখন বাবা চাকুরি করেন- পাকিস্তান আমলে বাবার বেতন আর কত তখন; কিন্তু তারপরও যেদিন আমার লেখা ছাপা হতো বাবা সেই পত্রিকাটা নিয়ে আসতেন বা কেনার জন্য পয়সা দিতেন। বেশি লাগত যে তা-না এক আনা, দুই আনা দাম ছিল কিন্তু সেটাও আমার জন্য বেশ প্রেরণার ছিল।
লেখকদের মধ্যে কার লেখা পড়ে আপনি প্রেরণা পেতেন?
আখতার হুসেন : আমার খুব ভালো লাগত রফিকুল হক দাদুভাই, মোহাম্মদ মোস্তফা, মো আবদুল মান্নান, নিয়ামত হোসেন তারপর হোসনে আরা, হেলেনা খান, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, কাজী রাশীদ আনোয়ারÑ এঁনারা খুব ভালো লিখতেন। তারপর এখলাসউদ্দিন আহম্মদ লিখতেন, আবার আলী ইমাম- আমার চেয়ে বয়সে ছোট কিন্তু তার লেখা আমার বেশ ভালো লাগত। এমন আরও অনেকে আছে সবার নাম বলে শেষ করা যাবে না। মাহমুদউল্লাহ তখন নতুন লেখালেখি শুরু করেছে। এখনও বাংলা একাডেমি পুরস্কারটা দেওয়া হলো না এটা বেশ দুঃখজনক।
শিশুসাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে একজন লেখক যেমন নিজেকে তৈরি করেন, তেমনি সমাজের নানান কিছু পরিবর্তনও করেন তিনি- বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আখতার হুসেন : লেখার মধ্যদিয়ে সমাজ পরিবর্তনে আমরা সরাসরি যুক্ত ছিলাম। খেলাঘরে যখন লেখা শুরু হতে থাকল, আমরা ততদিনে ঢাকা চলে এসেছি। আর পাতাবাহার বলে একটা পত্রিকা বের হতো তখন। তখন আমরা খেলাঘরের সাথে যুক্ত হলাম আর সংগঠন গড়ে তুললাম। শুধু লিখতাম না, নাচ, গান ইত্যাদি তৈরি করতাম। সারাদেশে আমরা খেলাঘর গড়ে তুললাম এবং ফুটবল টুর্নামেন্ট, ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করতাম আর পাশাপাশি লেখা ছাপা তো হতেই থাকত। নতুন যারা লিখত তাদের লেখা ছাপা হতো, এখনও কারো কারো সঙ্গে দেখা হলে এসব মনে পড়ে। তখন পাতা দেখতাম আমি আর এক বন্ধু। ভালো কোনো লেখা পেলে তা এনে ছাপার ব্যবস্থা করতাম আমরা। আর অন্যদিকে তো কচিকাঁচার আসর ছিলই। তাঁরাও সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করত। আর মুকুলের মেহফিলের কথা মনে পড়ল, আমাদের যারা অগ্রজ ছিলেন যাদের অনেকে এখন বেঁচে নেই, তারা মুকুলের মেহফিলে যেতেন। সম্মেলন করা, গান করা, চর্চা করা আর লেখালেখি তো আছেই এর মধ্যেই ছিলাম আমরা। এখন অনেক কমে গেছে এসব। খেলাঘর এখন দুইভাগে বিভক্ত, কচিকাঁচার আগের সেই অবস্থান এখন আর নেই। সক্রিয় না আরকি। এটা আমাদের জন্য খুব দুঃখজনক। ছোটদের জন্য যে-সব আসর ছিল, এসব যদি না থাকে, তবে আরও মুশকিল হয়ে যাবে।
আপনাদের সময়ে তো বই এত সহজলভ্য ছিল না, আজকে যেমন চাইলেই পরদিন বিদেশি বইও পাওয়া যায় এখন তো...
আখতার হুসেন : না না এটা কিন্তু ভুল! তখন তো বাংলাদেশ ছিল না, পাকিস্তান ছিল আর দেশের লোকজন বেশ ডিপ্রেসড ছিল তবু বই চেয়ে চিঠি লিখলেই বই পৌঁছে যেত। আমি বাংলাবাজার থেকে চিঠি দিয়ে এমন বই কিনেছি অনেক। এখন কিন্তু বই পাওয়া যায় তখনও পাওয়া যেত। ইংরেজি বই পাওয়া যেত মহিউদ্দিন এন্ড সন্স-এ। যেকোনো ইংরেজি বই পাওয়া যেত। আর এখন প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে অনেককিছু সহজ হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, যার জন্য বই পাওয়া যায় সহজে; কিন্তু সেসময় এতো সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যত ভালো ভালো কাজ হয়েছে তা আর এখন হয় না। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় এখন কেউ বই পড়ে কিনা। পাবলিক লাইব্রেরিতে গেলে দেখা যায় সবাই বিসিএসের বই পড়ছে। লাইব্রেরির শেলফে যে-সব বই আছে এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না- বই পোকায় খাচ্ছে আর পচে যাচ্ছে।
শিশুর বিকাশে শিশুসাহিত্য ভূমিকা রাখে- এই বিষয়ে আপনার থেকে জানতে চাই?
আখতার হুসেন : এক্ষেত্রে আমি বলব, প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে হাই-স্কুল পর্যন্ত যে বই দেওয়া হয় এবং তাদেরকে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করার জন্য যে শিক্ষক বা অভিভাবক থাকার দরকার ছিল তাও কিন্তু কমে গেছে। এর পেছনে একটা কারণ আছে, আমাদের সময়ে কিন্তু বাধ্যতামূলক ছিল দুইটা বই পড়তে হবে এমন। স্কুলেই ছিল এটা, এখন এটা নেই। তারপর কলেজে- আনন্দ মোহন কলেজেও তাই ছিল। দুর্লভ সব বই আর কত যে বই- বলে বোঝানো যাবে না। এখন যদিও কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে এই অভ্যাস, তবে সঠিকভাবে বই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আর কাজ হচ্ছে না। আপনাকে বলি আমাদের পারিবারিক একটা লাইব্রেরি করেছি- একটা স্কুলে সেটা আমার স্ত্রীর নামে। সেখানে স্টিলের আলমিরা দিয়েছি বই রাখবার জন্য। সেখানে দেখা গেল অভিধান আর ভালো ভালো বই যা ছিল তা-সব শিক্ষকরা নিয়ে চলে গেছে। আমি খুব হতাশ হয়েছি অথচ তারাই কিন্তু আমাকে ভীষণ উৎসাহিত করেছিল।
শিশুদের বই- পাঠ্যবইয়ের বাইরে যা আছে সেসব কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
আখতার হুসেন : দেখুন এখানে বয়সভিত্তিক একটা ব্যাপার আছে। শিশুদের পড়া এবং লেখা কিন্তু বয়সভিত্তিক- সে বাক্য লেখে সেইভাবে। একটা ছোট ছেলে যার বয়স পাঁচ বছর, সাত বছর পড়তে শিখছে মাত্র তারজন্য লেখা বইয়ের বাক্য জটিল হলে চলবে না। যেমন ‘নিশ্চিত’ এর মতো শব্দ লেখা যাবে না। বাক্য হতে হবে ছোট- যেন তাঁর দম আটকে না যায়। বয়স বিবেচনায় বই ছাপার যে প্রক্রিয়া সেটা আমাদের দেশে কেবল শুরু হয়েছে। আরেকটা কথা আমাদের দেশের প্রকাশনা সংস্থাগুলোতে সম্পাদক নাই, হাতেগোনা দুই একটা প্রকাশনাতে সম্পাদক আছে। এটা থাকলে হয় কী- বাচ্চাদের জন্য প্রকাশ হওয়া বইগুলো আলাদা যত্ন পায়।
গল্প, রূপকথা মায়েদের থেকে শুনেই শিশুরা বড় হয়। তারপর নিজেরা পড়তে শুরু করে- এই যে গল্প-রূপকথার প্রতি শিশুদের এত ঝোঁকের কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
আখতার হুসেন : শিশুরা সবসময় কল্পনার রাজ্যে যেতে চায়। তারা বিচরণ করে অজানা দেশে। সেজন্য রূপকথার প্রতি তাদের আলাদা ভালোলাগা কাজ করে। তারা যখন সিন্দাবাদের রূপকথা পড়ে কিংবা জাপানি রূপকথা পড়ে তখন কিন্তু তারা কল্পনায় ভাসে। বাস্তবের গল্প পড়তে যে পছন্দ করে না তা কিন্তু নয়- বাস্তবের গল্প পড়তেও ভালোবাসে। এইখানে আমার কিছু কথা আছে- বয়সভিত্তিক বই প্রকাশের যে বিষয়টা অর্থাৎ বয়স অনুযায়ী বইয়ের যে ব্যাপারটা এটা আমাদের দেশের প্রকাশকদের মধ্যে এখনও প্রবলভাবে কাজ করছে না। হালকা হালকা ভাবে কাজ করছে। কিন্তু এটা কিন্তু খুব সিরিয়ায়স ব্যাপার। কারণ আমি ভবিষ্যতের নায়ককে তৈরি করছি, বিশ্বের মানুষদের তৈরি করছিÑ তাদের প্রতি যদি আমি যত্নশীল না হই তাহলে দেশের কী হবে- তারা সুনাগরিক হবে কী করে! সে জায়গায় যত্নশীল হওয়া জরুরি প্রয়োজন।
আমাদের শিশুসাহিত্যে অভাবের দিকটা বলবেন?
আখতার হুসেন : আপনার এই প্রশ্নটা সকল প্রশ্নের বাইরে একেবারে- আমাদের শিশুসাহিত্যে একটা অভাব আছে। যেমন ধরুন- আমরা যদি পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবোÑ যারা বড়দের সাহিত্যচর্চা করে তারা ছোটদের জন্যও সমানতালে লিখে চলেছে। তারা ভূতের গল্প লিখেছে, রহস্য গল্প, গোয়েন্দা ইত্যাদি ইত্যাদি লিখেছে। আমাদের এখানে ভূতের গল্প, হাসির গল্পের খুব অভাব। হাসির গল্প তো আপনি খুঁজেই পাবেন না বলতে গেলে। সে জায়গায় আমাদের শিশুসাহিত্যিক যারা আছেন তাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত। নতুন যারা এসেছেনে তাদেরও দায়িত্ব নেওয়া উচিত, দুই-একজন দিয়ে এটা হবে না। বড়দেরও মনোযোগ দিতে হবে।
সে সময়ের কারও গল্প সম্পর্কে বলতে পারেন?
আখতার হুসেন : আমার এখনও একটা গল্পের কথা মনে আছে একটা হাসির গল্প ‘রেকর্ডভঙ্গ’ সেখানে একটা চরিত্র ছিল ফেলু মামা। নিয়ামত হোসেনের লেখা গল্প ছিল, তিনি যেমন হাসির গল্প লিখেছেন, তেমনি সিরিয়াস সাহিত্যও নির্মাণ করেছেন। ছড়া, ভূতের গল্প, রম্য কাব্য সবই লিখেছেন- সেই নিয়ামত হোসেনকে কেউ আর তেমন স্মরণ করে না। মোদ্দাবের, আতোয়ার রহমান, হাবীবুর রহমানকে এখন কে স্মরণ করে? সেইখানে আজকে কাউকে কেউ স্মরণ করে না। নিয়ামত হোসেনের ‘রেকর্ডভঙ্গ’ নামের হাসির গল্পটা, উনি প্রথম জমজমাট হাসির গল্প লেখেন বাংলাদেশে। গল্পটা এমন ছিলÑ ফেলু মামা সব ব্যাপারে একটা রেকর্ড করবে এমন অবস্থা। তো একবার তাকে বলা হচ্ছে ফেলু মামা এবার তো বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হবে, আপনি কিসে অংশ নেবেন? ফেলু মামা বলল- লং জাম্পে। ঠিক আছে তাহলে এবার রেকর্ড ভঙ্গ করতে হবে। কেউ যেন আপনাকে পিছু ফেলতে না পারে। সময় আসছে, ফেলুমামার বুক কাঁপছে তারপর যা হলো, একটা দূরত্বে এসে ফেলু মামা সবার পেছনে পড়ে থাকল। সবাই বলল- এটা কী করলেন মামা! আপনি তো বদনাম করে ফেললেন। ফেলু মামা আপনি তো পারলেন না, তখন ফেলু মামা বললেনÑ উলটা করে দেখো। উলটা করে দেখা গেল একটা রেকর্ড প্লে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে আছে। এইরকম আরও অনেকের বই যেমন এখন মনে পড়ল গোলাম রহমানের কথা এগুলো তো আমরা কেউ স্মরণ করি না। এই হচ্ছে আমাদের দশা। ছোটদের জন্য কয়টা মাসিক পত্রিকা বের হয় বলুন? টইটুম্বুরটা কেন জানি জনপ্রিয় হতে পারেনি। এমন করে আরও অনেক পত্রিকা জনপ্রিয় হতে পারেনি কেন জানি। এখন আমাদের কাছে মাসিক পত্রিকা কয়টা আছে, আমি তো খুঁজলে পাই না তেমন।
শিশুসাহিত্যে আপনার প্রিয় বইয়ের নাম বলবেন?
আখতার হুসেন : এটা তো কঠিন হয়ে গেলো, কাকে রেখে কার কথা বলি এমন হবে। ছোটবেলা আমাকে বাইরের বই দেওয়া নিষেধ ছিল, আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি আমার হাতে খুব সহজ ভাষায় লেখা দাসপ্রথা উচ্ছেদের উপর লেখা একটা বই বেশ ভালো লাগল। নাম মনে করতে পারছি না এখন। আর আমি আসলে কার নাম বলবো আপনি আমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছেন। হাবীবুর রহমানের লেখা লেজ দিয়ে যায় চেনা, বন মোরগের বাসা। আগডুম বাগডুম আমার খুব পছন্দের বই। সুফিয়া কামালের ছড়ার বই ইতল-বিতল আমার খুব পছন্দের। একবার একটা মজার ঘটনা হয়েছে ১৯৬৮ সালের দিকে। সুফিয়া কামালকে বাসা থেকে আনার দায়িত্ব আমাকে শহীদুল্লাহ কায়সার দিলেন। রুশ বিপ্লবের ৫০তম বার্ষিকীতে প্রধান অতিথি হিসেবে কথা বলবেন তিনি। শহীদুল্লাহ কায়সারের গাড়িতে চেপে গেলাম নিয়ে আসতে। আসার সময় কোনো কথা বললেন না, কিছু জানতেও চাইলেন না। আমরা কিন্তু পাশাপাশি বসে আছি। আবার যখন ফেরত যাচ্ছি তখন আমি জানতে চাইলাম- খালাম্মা যদি কিছু মনে না করেন এখন ইয়ং যারা ছড়া লিখছে তাদের মধ্যে কার লেখা আপনার ভালো লাগে? উনি আমার দিকে তাকিয়ে কিছু নাম বললেন, সেখানে আমার নামও ছিল; কিন্তু আমি আর সেদিন বলিনি যে আমিই আখতার হুসেন। আর প্রিয় বইয়ের নাম বলা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে কারণ প্রথম আমাকে আমার বাবা যে বই দিলেন সেটার নামই তো আমি মনে করতে পারছি না।
নতুন যারা লিখছে তাদের উদ্দেশ্য কী বলতে চান?
আখতার হুসেন : নতুন যারা লিখছে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের লেখা আমার নজর কেড়েছে এবং তারা বেশ ভালো লিখছে। আর নতুনদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই- শুধু ছড়া লিখলে বা গল্প লিখলে চলবে না। ছোটদের জন্য সবকিছু লিখতে হবে। আমাদের বিজ্ঞান নিয়ে লেখার লোক অনেক কমে গেছে। বিজ্ঞান নিয়ে লিখতে হবে, হাসির গল্প, ভূতের গল্প লিখতে হবে। প্রবন্ধ, ছোটগল্প সব লিখতে হবে আসলে। যারা নতুন এসেছেন তারা বেশ ভালো লিখছে, তারা যদি তাদের লেখার হাত প্রসারিত করে তাহলে আমাদের সাহিত্য অনেক সমৃদ্ধ হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
সূত্র : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ফেব্রুয়ারি ২০২৫ উপলক্ষে বেঙ্গল বুকস কর্তৃক প্রকাশিত বিষয়ভিত্তিক বিশেষ আয়োজন ‘সাড়ে তিন দিনের পত্রিকা’র শিশুসাহিত্য সংখ্যায় সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হয়। প্রিয় পাঠক, সাক্ষাৎকারবিষয়ক স্বাধীন প্লাটফর্ম মুখোমুখি’তে এটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো। সাক্ষাৎকারটি ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে গ্রহণ করা হয়।
